মেনু নির্বাচন করুন
খবর

কৃষকের উৎপাদন খরচ কমাতে মানসম্পন্ন উপকরণ সরবরাহে জোর দিচ্ছে বিএডিসি

মোনাসিরুজ্জামান

সচিবকৃষি মন্ত্রণালয়

সাক্ষাৎকার গ্রহণ

সাইদ শাহীন

 

বিএডিসির লক্ষ্য ২০২১ সালের মধ্যে

*       বীজ উৎপাদন আড়াই লাখ টনে উন্নীত করা

*       ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার ৭০ শতাংশে নামিয়ে আনা

*       সেচের আওতাভুক্ত জমি ৬০ লাখ হেক্টরে উন্নীত করা

*       সেচের দক্ষতা ৫০ শতাংশে উন্নীত করা

*        নন-ইউরিয়া সার সরবরাহ ১২ লাখ টনে উন্নীত করা

 

সাম্প্রতিক সময়ে বিএডিসির কী ধরনের অর্জন রয়েছে?

দেশের কৃষি উন্নয়ন ও সরকারের কৃষিনীতি বাস্তবায়নে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) ফসল উৎপাদনের তিন উপকরণ— মানসম্পন্ন বীজ, সেচ সুবিধা ও নন-নাইট্রোজেনাস সার কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এর ধারাবাহিকতায় গত তিন বছরে উল্লেখযোগ্য অর্জন হলো, বিভিন্ন ফসলের ৪ লাখ ২৭ হাজার টন বীজ উৎপাদন ও ৩ লাখ ৯২ হাজার টন বীজ সরবরাহ, ৩ কোটি ৪ লাখ চারা, গুটি, কলম উৎপাদন, সাত লাখ টন শাক-সবজি ও ফল উৎপাদন ইত্যাদি। এছাড়া ১ হাজার ৩৩ কিলোমিটার খাল-নালা পুনঃখনন, ১ হাজার ২৯৫ কিলোমিটার ভূউপরিস্থ ও ভূগর্ভস্থ সেচনালা নির্মাণ, ১ হাজার ১৮৫টি সেচ অবকাঠামো নির্মাণ, ২ হাজার ২৬৮টি সেচ যন্ত্রপাতি সরবরাহ, ২৮টি সোলার প্যানেলযুক্ত সেচযন্ত্র স্থাপন, তিন হাজার কূপ পর্যবেক্ষণ, ১৬ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা প্রদান, এক লাখ হেক্টর জমি নতুন করে সেচের আওতায় আনা, ৩১ লাখ ৩৪ হাজার টন নন-নাইট্রোজেনাস সার নির্ধারিত মূল্যে যথাসময়ে কৃষকদের মধ্যে সরবরাহ ও ১৭টি প্রিফ্যাব্রিকেটেড স্টিল সার গুদাম নির্মাণ করা হয়েছে।

বীজ উৎপাদনে বিএডিসি কী ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করে?

বীজের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো, গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবিত বীজগুলো কৃষকের কাছে যথাসময়ে পৌঁছে না। এজন্য উদ্ভাবিত ভালো মানের বীজ কৃষকের কাছে পৌঁছে দিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করা হচ্ছে। বিএডিসি মূলত বীজ মাল্টিপ্লাই করে কৃষকের কাছে পৌঁছানোর দায়িত্ব পালন করে। এক্ষেত্রে বারি, ব্রি ও বিনা থেকে ভিত্তিবীজ বা ব্রিডার সিড সংগ্রহ করে চুক্তিবদ্ধ কৃষকের মাধ্যমে ফাউন্ডেশন সিড তৈরি করে বিএডিসি। এরপর কন্ট্রাক্ট গ্রোয়ার্সদের মাধ্যমে সার্টিফায়েড ও মান ঘোষিত সিড তৈরি করে। এসব বীজ ডিলারদের মাধ্যমে সারা দেশের কৃষকদের কাছে বিক্রি করা হয়। সব বীজের ভিত্তি, প্রত্যয়িত ও মান ঘোষিত বীজের মান নিয়ন্ত্রণ করে বিএডিসি। বিএডিসির বীজ বিপণন হয় মূলত ডিলারদের মাধ্যমে। বিএডিসি একমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠান, যার কাজ হচ্ছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে উদ্ভাবিত ফসলের নতুন জাতের বীজ পরিবর্ধন করা। বীজের ক্ষেত্রে নতুন কোন জাত আসতে পারে, সে বিষয়ে কৃষকদের ধারণা দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। দেশের কৃষকদের কাছে নতুন নতুন জাত এককভাবে পৌঁছে দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। সাম্প্রতিক সময়ে বীজ বিপণন ও উৎপাদনে বেসরকারি খাত বিকশিত হয়েছে। তবে বাজারে বীজ সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখার পাশাপাশি দাম ও মান সহনশীল রাখতে বাড়তি উৎপাদনের মাধ্যমে মজুদও রাখা হচ্ছে।

বীজ বিপণনে বিএডিসি কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারছে?

ভিত্তিবীজের ক্ষেত্রে পুরোটা তৈরি করছে বিএডিসি। ভিত্তিবীজের পাশাপাশি প্রত্যয়িত অনান্য বীজও উৎপাদন করছে। বোরো ধানের বীজের ৬০ শতাংশ চাহিদা পূরণ করছে বিএডিসি। আমন ধানের ক্ষেত্রে এ চাহিদা পূরণের হার ১৮-২০ শতাংশ। আউশ ধানের ক্ষেত্রে এইচওয়াইভি বীজের প্রায় ৪০ শতাংশ চাহিদা পূরণ করছে বিএডিসি। গমের ক্ষেত্রে এ চাহিদা পূরণের হার প্রায় ৭০ শতাংশ (সার্টিফায়েড সিড)। বাকি যে বীজ, তার কিছুটা কৃষক নিজেরা তৈরি করছেন। পাশাপাশি কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও আছে, তারাও বীজ তৈরি করছে। মূলত আমনবীজটা কৃষকরা নিজেরাই উৎপাদন করছেন ও সংগ্রহে রাখছেন। আর এইচওয়াইভি বীজ মূলত বিএডিসি ও বিভিন্ন কোম্পানি তৈরি করে।

সেচের দক্ষতা বাড়াতে কী ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছেন?

সেচ ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে আনা। এক দশক আগেও মোট পানির ৮০ শতাংশই ছিল ভূগর্ভস্থ। এখন সেটি ৭৬ শতাংশে নেমে এসেছে। পর্যায়ক্রমে সেটি ৬০ শতাংশে নামিয়ে আনতে কাজ করা হচ্ছে। এজন্য গভীর নলকূপ কোথায় কীভাবে স্থাপন হবে, কত দূরত্বে তা স্থাপন করা হবে, সে বিষয়ে নীতিমালার আলোকে পরিচালনা করা হচ্ছে। বিভিন্ন ক্ষমতার শক্তিচালিত পাম্প স্থাপন, বিদ্যুতায়ন, সেচের পানির অপচয় রোধ করার নিমিত্তে ভূউপরিস্থ ও ভূগর্ভস্থ সেচনালা (বারিড পাইপ) নির্মাণ কার্যক্রম সম্পাদনের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি ও প্রকল্প নেয়া হয়েছে। এসব কর্মসূচিতে বারিড পাইপ, ডাগওয়েল, এডব্লিউডি পাইপ ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। তাছাড়া বৃষ্টির পানির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এজন্য গভীর নলকূপ পুনর্বাসন ও শক্তিচালিত পাম্প স্থাপন করা হচ্ছে। পাহাড়ি এলাকায় ঝিরিবাঁধ নির্মাণ, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে সেচ সম্প্রসারণ ও সাবমার্জড ওয়্যার নির্মাণ করা হচ্ছে। এছাড়া আর্টেশিয়ান কূপ খনন, ডাগওয়েল ও স্প্রিংকলার সেচ পদ্ধতি প্রয়োগ, ফিতা পাইপ বা বারিড পাইপ সংযুক্তকরণ, মাটির বাঁধ বা বেড়িবাঁধ নির্মাণ, সেচ নিয়ন্ত্রক পাইপ (সেনিপা) সরবরাহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুতের সাহায্যে সেচপাম্প স্থাপন করা হচ্ছে।

ভূউপরিস্থ পানির প্রাপ্যতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেয়ার মাধ্যমে অধিক পরিমাণে খাল-নালা খনন ও পুনঃখনন করা হচ্ছে। সঠিক পরিমাণ পানি ব্যবহারের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের অবনমন রোধ করতে সেচ দক্ষতা বাড়ানো হচ্ছে। এতে ভূউপরিস্থ পানির প্রাপ্যতা বাড়ছে ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পূরণ সম্ভব হচ্ছে। এছাড়া ভূউপরিস্থ সেচনালা ও ভূগর্ভস্থ সেচনালা স্থাপনের ফলে পানির অপচয় কমছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলনির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে সৌরশক্তিচালিত পাম্প স্থাপন কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। গভীর নলকূপ পুনর্বাসনের ফলে দীর্ঘদিন ধরে অচল ও অকেজো অবস্থায় পড়ে থাকা গভীর নলকূপে বিদ্যুৎ সংযোগ নির্মাণ করে তাতে সাবমার্সিবল পাম্প স্থাপন করা হচ্ছে। এতে কম খরচে অধিক পানি উত্তোলন করা সম্ভব হচ্ছে। শক্তিচালিত পাম্প স্থাপনের ফলে ভূউপরিস্থ পানি ব্যবহার করে বেশি জমিতে সেচ দেয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে কৃষকের সেচের খরচ কমানোর পাশাপাশি পানির স্তরেও ভারসাম্য আনা সম্ভব হচ্ছে।

সেচ কার্যক্রমে সোলার ব্যবহারে অগ্রগতি কতটুকু?

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলনির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে ঢাকা জেলার ধামরাই, সাভার, গাজীপুর সদর, নরসিংদীর রায়পুরা, শেরপুরের নালিতাবাড়ী, নেত্রকোনার পূর্বধলা, গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া ও টুঙ্গিপাড়া, ময়মনসিংহের গফরগাঁও, কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী ও ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় একটি করে মোট ১১টি সৌরশক্তিচালিত সেচপাম্প স্থাপন কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। এ সফলতার ধারবাহিকতায় আরো একটি বড় প্রকল্প নেয়া হয়েছে। ৮২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা ব্যয়ে দেশের আট বিভাগের ৩৪টি জেলার ১৪১ উপজেলা ‘সৌরশক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ক্ষুদ্র সেচ উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে। প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, সৌরশক্তিচালিত লো-লিফ?ট পাম্প (এলএলপি) স্থাপন ও অন্যান্য সেচ অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে ২ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে ভূউপরিস্থ পানিনির্ভর সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ করে প্রতি বছর অতিরিক্ত প্রায় ১১ হাজার টন খাদ্যশস্য উৎপাদন করা। এছাড়া সেচকাজে সৌরশক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও বিদ্যুৎ সুবিধা নেই, এমন এলাকায় সৌরশক্তিনির্ভর সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রকল্প এলাকায় আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি ও দারিদ্র্য বিমোচন করাও এর উদ্দেশ্য।

সার সরবরাহ ব্যবস্থায় কী ধরনের উন্নতি করতে চান?

সার আমদানি ও সরবরাহ কার্যক্রমকে সুসংহত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। গত এক দশকে দেশে সার সরবরাহে ব্যাপক উন্নতি আনা সম্ভব হয়েছে। তবে এখন গুণগত সার ব্যবহারে জোর দেয়া হচ্ছে। ইউরিয়া সার ব্যবহার কমিয়ে এনে নন-ইউরিয়া সার ব্যবহার বাড়াতে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। ২০২০-২১ সালের মধ্যে নন-ইউরিয়া সার আমদানি ও বিতরণের পরিমাণ ৯ লাখ ৮৮ হাজার থেকে বৃদ্ধি করে ১২ লাখ টনে উন্নীত করা হবে। পর্যায়ক্রমে তা ২০ লাখ টনে উন্নীত করা হবে। এছাড়া দেশের সার গুদামগুলোর ধারণক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। সার ব্যবস্থাপনা বিভাগের আওতাধীন গুদামের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। বিএডিসির ভাড়া দেয়া বড় গুদামগুলোর চুক্তি আর নবায়ন না করে সার ব্যবস্থাপনা বিভাগের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ভাড়া দেয়া গুদামগুলো ফিরিয়ে এনে সার সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বিএডিসির কী ধরনের পরিকল্পনা রয়েছে?

দেশের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে নিজস্ব খামারে ও চুক্তিবদ্ধ চাষীদের মাধ্যমে মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদন করা, প্রাপ্যতা হ্রাস পাওয়ায় প্রাপ্য ভূউপরিস্থ পানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিপর্যয় থেকে কৃষি ব্যবস্থাকে রক্ষা করা এবং মানসম্পন্ন নন-নাইট্রোজেনাস সার কৃষক পর্যায়ে সঠিকভাবে যথাসময়ে সরবরাহ করাই মূলত প্রধান চ্যালেঞ্জ। এজন্য কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ২০২১ সালের মধ্যে বীজ উৎপাদন ও সরবরাহের পরিমাণ ২ লাখ ৫০ হাজার টনে উন্নীত করা হবে। এছাড়া ভূপরিস্থ পানির প্রাপ্যতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেয়ার মাধ্যমে অধিক পরিমাণে খাল-নালা খনন ও পুনঃখনন করা হবে। পরিকল্পনা রয়েছে সঠিক পরিমাণ পানি ব্যবহারের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অবনমন রোধ করার। বৃষ্টির পানি ও ভূউপরিস্থ পানির সংরক্ষণক্ষমতা বৃদ্ধি করতে টেকসই প্রযুক্তি নেয়া হবে। সেচ দক্ষতা ৩৪ থেকে থেকে ৫০ শতাংশে উন্নীতকরণ, ২০২১ সালের মধ্যে ফলন পার্থক্য প্রতি হেক্টরে তিন থেকে এক টনে নামিয়ে আনা এবং ফসলের নিবিড়তা বাড়ানোর জন্য কার্যকর পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে। এছাড়া ২০২১ সালের মধ্যে সেচ এলাকা ৫৪ লাখ ৮৮ লাখ থেকে ৬০ লাখ হেক্টরে উন্নীত করা হবে। প্রিপেইড মিটার স্থাপনের মাধ্যমে গভীর নলকূপ, সেচযন্ত্রের জরিপ ও পরিবীক্ষণ, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পরিবীক্ষণ ও উপকূলীয় অঞ্চলে লবণ পানি অনুপ্রবেশ পরিবীক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে।

ছবি


ফাইল


প্রকাশনের তারিখ

২০১৮-১০-১০

আর্কাইভ তারিখ

২০১৮-১২-৩১



Share with :

Facebook Twitter